সমম্ভাবনাময় সুন্দরবনের করমজল স্পটে নানা সমস্যায় পর্যটকরা

শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন। বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম এ সুন্দরবনকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে ইউনেস্ক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে জীব বৈচিত্রের এ সুন্দরবন ব্যবস্থাপনায় দু’ভাগে বিভক্ত। এতে রয়েছে ৪ টি প্রশাসনিক রেঞ্জ। পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাট এবং পশ্চিম বন বিভাগ খুলনায় অবস্থিত। চাঁদপাই রেঞ্জ এবং শরণখোলা রেঞ্জ পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটে এবং খুলনা রেঞ্জ ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ পশ্চিম বন বিভাগে।

পূর্বাঞ্চলের করমজল, হাড়বাড়িয়্, কটকা,কচিখালী এবং পশ্চিমাঞ্চলের হিরণ পয়েন্ট, মুন্সিগঞ্জ, কলাগাছিয়া ও শেখেরটেক সর্বমোট এ ৮ টি পয়েন্ট থেকে সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এর মধ্যে বেশিরভাগ্ দুর্গম, সময় সাপেক্ষ , ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় টুরিষ্ট স্পট হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের করমজল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেষ্টের ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র করমজল বণ্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নারী-পুরুষ শিশু ও ছাত্র-ছাত্রী সহ প্রতিদিন শত শত দেশি বিদেশী পর্যটকের ভিড় জমে এখানে। করমজল পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হলেও পাণীয় জল সহ নানা সমস্যার কারণে সন্তুষ্ট নয় পর্যটকরা।

সুন্দরবন ভ্রমণ ও প্রাথমিক ধারণা নিতে পূর্ব সুন্দবন বিভাগের অধীনে চাঁদপাই রেঞ্জের একমাত্র টুরিষ্ট স্পট করমজল। এখানে হাত দিয়ে হরিণ ছোঁয়া যায়,খাবার খাওয়ানো যায়। হাতে বাদাম, কলা নিয়ে উন্মুক্ত বানরকে ডাক দিলে চলে আসে। হাত থেকে নিয়ে নেয় বাদাম, কলা। যারা প্রত্যক্ষ কুমির দেখেনি তাদের জন্য করমজল উপযুক্ত স্থান। রৌদ্দ্রজ¦ল ডাঙ্গায় কিংবা জলে ভাসমান বিশাল আকারের কুমির দেখলে শিহরণ জাগে মনে। দেড় কিলোমিটারের কাঠের ট্রেইল ঘুরে সুন্দরবনের সুন্দরী ,কাঁকড়া, বাইন গাছ সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ দেখতে পাওয়া যায়, ছোঁয়া যায়। মাঙ্কি ট্রেইল হিসেবেও পরিচিত এ আঁকাবাকা কাঠের ট্রেইলে হাঁটার সময় চোঁখে পড়ে গাছে গাছে বানর। দেশে প্রাকৃতিকভাবে কুমির প্রজননের একমাত্র কেন্দ্র এ করমজল। এখানে কচ্ছ্বপেরও প্রজনন হচ্ছে । করমজলের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে কুমির,বানর, চিত্রা হরিণ, কচ্ছ্বপ , কাঠের ট্রেইল, ওয়াচ টাওয়ার।

সুন্দরবনের গাছ গাছালি, বণ্যপ্রাণী স্বচক্ষে দেখা ও ছোঁয়ার আকুলতা নিয়ে প্রতিদিন শত শত পর্যটক করমজলে আসলেও তাদেরকে নানা প্রতিকূলতা ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পশুর নদীর তীরবর্তী এ পর্যটন কেন্দ্রে যেতে পার হতে হয় এ নদী। পর্যটকদের ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে এ নদী পার হতে হয়। সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘন্টা। তাছাড়া রয়েছে যাতায়াত ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা। নৌযানের অভাবে পর্যটকদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এটি এক প্রতিকূল জায়গা ।

সুন্দরবনের করমজলে পর্যটকদের জন্য প্রধান সমস্যা পাণীয় জল ও পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা। বিশ্রাম নেয়ার জন্য তেমন কোন জায়গা নেই। ভ্রাম্যমান কিছু দোকান থাকলেও দাম দ্বিগুন। কাঠের ট্রেইলটি এখন নড়বড়ে অবস্থা। পর্যটকদের পদচারনায় যে কোন মূহুর্তে ভেঙ্গে পড়তে পারে। দেড় কিলোমিটারের কাঠের ট্রেইলে পর্যটকদের নিজ নিরাপত্তায় চলতে হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় উন্মুক্ত বানররা প্রায়ই চড়াও হয় পর্যটকদের উপর। সর্তকতা সাইনবোর্ড থাকলেও অনেক অতি উৎসাহী পর্যটকরা ঝুঁকি নিয়ে ঢুকে পড়ে বনের ভিতরে।
করমজলে ঘুরতে আসা পর্যটক কুষ্টিয়ার লিটন হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক লীলাভুমি সুন্দরবনের করমজলে বাঘের দেখা না পেলেও এখানে কুমির, বানর ,হরিণ দেখতে পেয়েছি।

এখানে পর্যকটদের মানসম্মত কোন ব্যবস্থা নেই। নেই খাবারের ব্যবস্থা। যে খাবার পর্যটকরা নিয়ে আসে তা নষ্ট হয়ে যায়। নেই পাণীয় জলের ব্যবস্থা।’ বনভোজন ও করমজলে এসে মোরেলগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জামাল শরীফ জানান, ‘যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনে বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল। কাঠের ট্রেইলটি জরাজীর্ণ। যে কোনে সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। খাবারের ব্যবস্থা নেই, হোটেল নেই, মোটেল নেই, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, বসার ব্যবস্থা নেই।

করমজল ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির ভোরের কাগজকে বলেন, ‘পর্যটকদের বসার জন্য ৫টি গোলঘর ও কয়েকটি বেঞ্চ রয়েছে। পাণীয় জলের ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে এসব সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। বাহির থেকে আমাদের পানি নিয়ে আসতে হয়। সমস্যার বিষয়গুলো উর্ধ¦তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অপেক্ষাকৃত সহজ যাতায়াত, কম সময় সাপেক্ষ এবং সাশ্রয়ী ব্যয়যোগ্য হওয়ার কারণে সুন্দবনের স্পট হিসেবে সম্ভাবনাময় এ করমজলের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে এটি আরও আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হবে বলে অনেকের ধারণা।

বার্তা প্রেরক
এইচ এম জসিম উদ্দিন
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন