ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় তৃণমূল আওয়ামীলীগের বটগাছ হিসাবে খ্যাত ছিলেন সদ্য প্রয়াত দলটির বর্ষীয়ান ও প্রবীণ নেতা শিকদার মোশাররফ হোসেন। দলে দুই মেয়াদে টানা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক, অতঃপর দলটির সভাপতি এবং পরপর দু’বার নির্বাচিত হন উপজেলা চেয়ারম্যান। আমৃত্যু আওয়ামীলীগের কান্ডারী হিসাবে ভূমিকা রাখা এই বর্ষীয়ান নেতা গত ৪ নভেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দলে দীর্ঘ অবদান রাখা তৃণমূল এই নেতার অসহায় পরিবার এখন দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কে পাশে চান। বাবার মতো দলে ভূমিকা রাখতে চান এই আওয়ামী পরিবারের উত্তরসূরীরা।
দলীয়সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন শিকদার মোশাররফ হোসেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনা ১৯৭২ সালের দিকে দল মূল দলে সক্রিয় হতে থাকেন । আওয়ামী রাজনীতির শুরু থেকেই জনপ্রতিনিধি হিসাবে এই নেতা সাধারণ মানুষের মাঝে জায়গা করে নিতে থাকেন। ১৯৭২ সালে ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান, ১৯৯১ সালে ইউপি চেয়ারম্যান, ২০১৪ সাল থেকে পরপর দু’দফা নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে দলের কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয়দফা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তার হাত ধরেই সংগঠিত হতে থাকে উপজেলা আওয়ামীলীগ।
উপজেলাটি বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত এবং প্রতিবার এই আসন থেকে বিএনপির সাংসদ নির্বাচিত হয়ে আসে। তবে শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনার মাধ্যমে আওয়ামীলীগ তৃণমূলে ক্রমেই সংগঠিত হতে থাকে। কোন্দল-বিভেদ আর দুঃসময়েও দলের কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে থাকায় তৃণমূল আওয়ামীলীগের বটগাছ হিসাবে খ্যাতি পান এই নেতা। এরপর ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কে হটিয়ে প্রথমবারের মতো ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনটি আওয়ামীলীগের হাতে আসে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই । দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে শিকদার মোশাররফ হোসেনের নাম। এরপর ২০১৬ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হন শিকদার মোশাররফ।
২০২০ সালের ৪ নভেম্বর দলের এই বর্ষীয়ান ও প্রবীণ নেতা উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলটির সভাপতি থাকা অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দলের হাজার হাজার নেতা কর্মী এমন কি সর্বসাধারণের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। এই নেতার মৃত্যুতে উপজেলা আওয়ামীলীগ হয়ে পড়ে অভিভাবক শূণ্য। তৃণমূলে যে শূণ্যতা তৈরী হয়েছে তা আদৌ পূরণ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় দলটির শীর্ষ নেতাদেরও । ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সাংসদ আব্দুল হাই তার মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়ায় জানান, শিকদার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে হারিয়েছেন দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক সহচর। দলের বিপদ-আপদে কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন তার সাথে। জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু জানান, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামীলীগ হারিয়েছে দলের আদর্শবান এক প্রবীণ ও বর্ষীয়ান নেতা। এভাবে জেলার শীর্ষ সকল নেতা দলের এই নেতার মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েছেন। শোকাতুর পরিবারের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছেন।
এদিকে আমৃত্যু দলে অবদান রেখে যাওয়া শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনার পরিবার এখন অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের আশা এই আওয়ামী পরিবার থেকে নেতৃত্বে আসুক তার সন্তান বা পরিবারের কেউ । তৃণমূলে বাবার মতোই হাল ধরুক এই পরিবার। আমৃত্যু আওয়ামীলীগে অবদান রেখে যাওয়া শিকদার মোশাররফ হোসেনের পরিবারও এমন অবস্থায়, দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কে পাশে চান। উপজেলা আওয়ামীলীগের অনেক নেতা জানিয়েছেন, শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনার ছোট ছেলে শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকু গত প্রায় ১০বছর তার বাবার সাথে সক্রিয় থেকেছেন আওয়ামী রাজনীতির সাথে। ছাত্রলীগের রাজনীতি করার পর হয়েছেন উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি। পদপদবীর তেমন আকাঙ্খা তেমন নেই শিকদার পুত্রের। কিন্তু একজন যোগ্য সংগঠক হিসাবে দলে ভুমিকা রেখে চলেছন বরাবর।
৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামীলীগের প্রধান নির্বাচনী অফিসের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানান তৃণমূল নেতারা। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শৈলকুপা পৌরসভার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকু। এসবের পাশাপাশি নানা সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বিএসএস শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী ওয়াহিদুজ্জামান ইকু বর্তমানে উপজেলা ক্রিড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসাবে সুনামের সাথে ক্রিড়াঙ্গনে ভূমিকা রেখেছেন। কর্মীরা বলছেন, শিকদারপুত্র ইকু দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নেপথ্য বা পরোক্ষ ভাবেই। ফলে শৈলকুপা আওয়ামীলীগ, অঙ্গ সংগঠন সহ সবার কাছে প্রিয়মুখে পরিনত হয়েছেন।
দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামীলীগ কে সংগঠিত করতে মোশাররফ হোসেন সোনার যে লাখো কর্মী-সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ছিল তারা চান, আগামীতে উপজেলা আওয়ামীলীগে সক্রিয় ভূমিকা রাখুক তার যোগ্যপুত্র, মিষ্টভাষী ও দলে তরুনদের মধ্যে ইমেজধারী শিকদার ওহাহিদুজ্জামান ইকু। এমন প্রত্যাশার চাপ পূরণ করতে শৈলকুপার আসন্ন পৌর নির্বাচনে ইকু মেয়র পদে প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন পত্র কিনেছেন। জনসেবা করতে, জনপ্রতিনিধি হতে দলের তৃণমুলের সমর্থন ক্রমেই বাড়ছে তার প্রতি। যদিও দলটি এখানে নানাভাবে বিভক্ত তবুও শৈলকুপার পোড় খাওয়া অনেক নেতার আশির্বাদ রয়েছে শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকুর প্রতি। বর্ষিয়ান নেতা শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনার মৃত্যুতে দলের অসমাপ্ত কাজ, দলের ঐক্য অটুট রাখা এবং আগামীতে নৌকার এক কান্ডারী হতে শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকু তিল তিল করে এগিয়ে চলেছেন বলে দলের একাধিক নেতা মত প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এই পরিবাররের প্রতি নজর দিবেন বলে তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশা।
বাবার অবর্তমানে রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হওয়া আগ্রহ প্রকাশ করে ওয়াহিদুজ্জামান ইকু বলেন, বাবার রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি রাজনীতি করবেন। করতে চান জনসেবা, জনপ্রতিনিধি হয়ে জনতার দোরগোড়ে সেবা পৌছে দিতে চান। আসন্ন পৌর ভোটে মেয়র প্রার্থী হিসাবে দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশির্বাদ চান। তিনি বলেন আওয়ামীলীগের সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করবেন, শৈলকুপা পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসাবে দোয়া-সমর্থন চাইবেন, বলবেন দলীয় মনোনয়নের কথা । দেখা করবেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথেও। স্মরণ করিয়ে দিবেন তার বাবার সংগ্রামী আওয়ামী রাজনীতির কথা। উত্তরসুরী হিসাবে চাইবেন দোয়া ও সমর্থন।
বার্তা প্রেরক
মনিরুজ্জামান সুমন
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি












