হাওরে বোরো ধানের ভালো ফলন, আগাম বন্যার পূর্বাভাসে কৃষকের দুশ্চিন্তা

দেশের চলমান করোনা সংকটের মাঝেও কৃষকের কাছে ভালো খবর হাওরে হাওরে বোরো ধানের প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফলন। জমিতে থোকায় থোকায় ধানের বাতাসে দোল খাওয়া দেখে সুন্দর দিনের স্বপ্ন কৃষকের চোখে।

পাঁকা- আধাপাঁকা ধানের জমি দেখে দেখে কৃষক নির্দৃষ্ট দিনের অপেক্ষায়। অনেক কৃষক গোলায় তোলতে শুরু করেছেন ধান। এ বছর সুনামগঞ্জ জেলার ছোট বড় ৩৩টি হাওরে ২লক্ষ ১৯হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে ভালো ফলন হয়েছে বোরো ধানের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে দ্রুত সময়ে এসব ধান জমি থেকে কেটে ঘরে আনতে হার্ভেস্টার মেশিন পৌছে গেছে হাওরে।

বরাদ্দকৃত ৩৩টি হার্ভেস্টার মেশিনের মধ্যে ১৯টি ইতিমধ্যেই সকাল থেকে বিকাল অব্দি ধান কাটছে। পাশাপাশি ১৯৩টি রিপার মেশিনও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সুনামগঞ্জের কৃষকদের জন্য। সেগুলোরও বেশ কিছু কাজে লেগে গেছে।

কিন্তু হঠাৎ করেই ভালো এই খবরের মাঝে কৃষকরা পেয়েছেন অশনি সংকেত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল সময়ে ভাড়ি বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যা দেখা দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

শুরু হয়ে গেছে ঝড়-বৃষ্টিও। গত ২দিন ধরে ভাড়ি বৃষ্টি ও তীব্র দমকা হাওয়াসহ ঝড় বইতে শুরু করেছে।

এমন আবহাওয়া কৃষককে ফেলে দিয়েছে দুশ্চিন্তায়। কেননা বৃষ্টিপাত থাকলে হাওরে রয়েছে বজ্রপাতের সম্ভাবনাও। ইতিমধ্যেই বজ্রপাতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় বজ্রপাতে ৪কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, রোদ না থাকলে ধান শুকানো নিয়েও কৃষককে পরতে হবে বিপাকে। এ অবস্থায় তারা আরও দ্রুত ধান কাটতে মরিয়া। কিন্তু এই করোনা পরিস্থিতিতে রয়েছে শ্রমিক সংকটও। কৃষকের ভাবনার তাই অন্ত নেই।

তার পরেও বিগত বছরগুলোর মতো ভূল করতে চাননা কৃষকরা। যতোটা সম্ভব আধাপাকা ধানেও তারা কাচি লাগিয়েছেন জোড়েসোরেই।

যান্ত্রিক সুবিধা এখনই সকল হাওরে সমানভাবে চালু না হওয়ায় সনাতন পদ্ধতিতে কোমর বেধে সমানে ধান কাটছেন নানা বয়সি কৃষক। অন্ততো আর যা ই হোক বিগত বছরগুলোর মতো নিজে না খেলেও কৃষকদের গবাদি পশুগুলোকে খড় না দিতে পারার কষ্ট এবার আর চাননা কৃষকরা।

আধপাকা বা কাচা ধানে প্রয়োজনে চাল না হলেও এবার গবাদি পশুর জন্য খাবার হতে হবে। এই ভাবনা নিয়ে বৈরি আবহাওয়াতেও জমির সব ধান কেটে ঘরে আনতে চান তারা।

জেলার খরচার হাওর ও দেখার হাওরের মতো বড় হাওরে ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে ধানকাটা শুরু হয়েছে। জমি থেকে ভাড়ে করে আটি আটি ধান খলায় নিয়ে আসছেন কৃষকরা।

খলায় মারাই শেষে কৃষাণীরা ঝেড়ে নেয়ার কাজসহ যতোক্ষণ রোদের দেখা মিলছে ধানগুলো শুকিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এই ক্ষেত্রেও এবার তারা সকলেই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে কাজ করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সফর উদ্দিন জানিয়েছেন, এবছর ভালো ফলন হওয়ার পাশাপাশি ফসল দ্রুত ঘরে তুলতে যান্ত্রিক সুবিধা কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে পৌছে দেয়ার কাজ করছেন তারা, বরাদ্দকৃত সকল মেশিন দ্রুত সকল হাওরে পৌছে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে আবহাওয়া নিয়ে কৃষকদের মতোই শঙ্কিত তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন‘ আমরা ঝুঁকি মোকাবেলায় সকল বাধগুলোর যেসব স্থানে সন্দেহ আছে সেখানেই প্রচুর জিও ব্যাগ, সিনথেটিক বস্তা দিয়ে আরও শক্তপোক্তভাবে আগাম বন্যার ঢলের পানিকে মোকাবেলা করতে সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছি, দ্রুত সকলকে ধান কাটার জন্য অনুরোধ করছি’।

জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন ‘ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরের কৃষকদের জন্য যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে সুবিধা প্রধান করতে নির্দেশনা দেয়ার পর থেকে সকল হাওরের জন্য হার্ভেস্টার মেশিন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি সকল কৃষকদেরকে সনাতন পদ্ধতিতেও দ্রুত ধান কাটতে বলা হয়েছে, ভালো ফলন হওয়াতে যদি সকল ধান আমরা ঘরে তোলতে পারি তাহলে করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার কোন সম্ভাবনা নেই’।

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন