করোনাভাইরাসের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জে নানা সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে ‘এপি সেন্টার’। কিন্তু এরপরও করোনা আক্রান্ত রোগীরা যেন এখনও অস্পৃশ্যই আশপাশের লোকজনের কাছে।
এমনকি সুস্থ হয়ে আসার পরও এলাকাবাসীর আচরণে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বেগ পাচ্ছেন অনেকেই। শুধু তাই নয়, আক্রান্তের পরিবারের সদস্যরাও এলাকাবাসীদের নেতিবাচক ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩ মে জ্বর, সর্দিসহ নানা উপসর্গ নিয়ে নমুনা পরীক্ষা করান রূপগঞ্জের রূপসী এলাকার নাজমুল। ৬ মে রিপোর্টে তার পজিটিভ এলে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসাতেই ছিলেন তিনি।
কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গভীর রাতে বাড়ির মালিকসহ এলাকার কিছু লোকজন এসে জোর করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। শেষ পর্যন্ত রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগমের হস্তক্ষেপে পুলিশ নাজমুলকে তার ভাড়া বাসায় দিয়ে আসেন।
২৬ মার্চ থেকে করোনা উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ ছিলেন লিসান ওরফে হিরু। আইইডিসিআর হটলাইনে দু’দিন চেষ্টা করেও তার টেস্টের ব্যবস্থা করতে পারেনি পরিবার। শেষে ৭ এপ্রিল জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর পর গিটারিস্ট হিরু লিসানের লাশ ৯ ঘণ্টা বাড়ির সামনে পড়েছিল।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে কেউ লাশের কাছে যাওয়ার সাহস করেননি। অপরদিকে করোনা রোগীদের দিন রাত সেবা দিতে দিতে নিজেই করোনায় আক্রান্ত হন জেলা সিভিল সার্জন অফিসের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শিল্পি আক্তার।
ফতুল্লার কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা ডা. শিল্পির একান্নবর্তী পরিবারের প্রায় ১৮ জন সদস্যও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এমন গুজবে ওই বাড়িতে ইটপাটকেল পর্যন্ত ছোরা শুরু করেন এলাকাবাসী।
বাড়ির লোকজনকে বাইরে থেকেই তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এমনকি বাড়ির সবার নমুনা সংগ্রহ করতে আসা অ্যাম্বুলেন্সটি পর্যন্ত প্রবেশে বাধা দেয় এলাকার লোকজন। শেষ পর্যন্ত সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিকের নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
জানা গেছে, এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে করোনা আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবারের সঙ্গে। অনেকে লোকভয়ে আক্রান্তের সংবাদও চেপে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
সম্প্রতি শহরের জামতলা এলাকার একটি পরিবারের সঙ্গে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। মেহেদী হাসান নামের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্তের পর প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তিনি ও তার পরিবার।
এমনকি নিজে সুস্থ হয়ে আসার পরও মেহেদীকে এখনও এড়িয়ে চলেন তার প্রতিবেশীরা। সুস্থ হয়ে আসা মেহেদী হানান জানান, আমার করোনা পজিটিভ হওয়ার পর আমার মা আমাকে ফোন করে জানালেন তার বাড়িওয়ালা তাকে চলে যেতে বলছে। অথচ আমি ও আমার মা দুই এলাকায় বসবাস করি।
বিষয়টি পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে তারা পরিস্থিতি সামাল দেয়। মেহেদীর স্ত্রী নাজমুয়ারা সুলতানা সিমু জানান, আমার স্বামীকে চিকিৎসকরা বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিলেও এলাকাবাসীর অনেকের চাপে তাকে ক্লিনিকে পাঠাতে হয়েছে।
আমি ও আমার ২ সন্তান হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় ৪ দিন নানা জায়গায় ফোন দিয়েও নমুনা নেয়াতে পারিনি। এমনকি কেউ উঁকিও দেননি।
আমি নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ হলেও বারান্দায় পর্যন্ত আমাকে দেখলে আশপাশের ভবনের মানুষ দৌড়ে পালিয়ে যেত। আমার স্বামী সুস্থ হয়ে এলেও এখনও কোনো আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশী আমাদের খোঁজ নেয়া দূরে থাক, কথাও বলেন না।
এ ব্যাপারে জেলা করোনা সমন্বয় কমিটির ফোকাল পার্সন ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। ঘরে বসেই প্রতিদিন শত শত রোগীকে মোবাইলে চিকিৎসাসেবা ও নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছি।
তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত হওয়া মানেই যে মৃত্যু তালিকায় নাম উঠে গেল এমন ভ্রান্ত ধারণা অনেকের মাঝেই আছে।
রোগী পাওয়া গেলেই এলাকার সবাই মিলে ছুটল তার বাড়িতে তালা মারতে। অথচ সরকার বলেছে, ঘরে থাকুন কারণ যার করোনা হয়েছে সে ঘরে থাকলে রোগটি ছড়াবে না।
আর বাইরে থাকলেই ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই সবার উচিত রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা অনুযায়ী সেবা নিতে সাহায্য করা।
করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া জেলা সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি আরিফ আলম দীপু বলেন, আমার পরিবারের সন্তান-স্ত্রীসহ ৩ জন করোনায় আক্রান্ত ছিলাম।
চিকিৎসকের পরামর্শ ও মনোবলের কারণেই আমরা সুস্থ হয়েছি। কিন্তু দেখছি অনেকেই করোনা রোগীকে ঘৃণা করছেন, ভয় পাচ্ছেন যা অত্যন্ত নেতিবাচক বিষয়। এমনটি যারা করেন তারা এই মানব সভ্যতায় থাকার উপযুক্ত নয়।












