শেরপুরের ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনের মহৎ দৃষ্টান্ত, যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন তার ভিক্ষা করে জমানো ১০ হাজার টাকা ত্রাণ তহবিলে জমা দিয়ে যে মহানুভবতা দেখিয়েছেন তা দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। তার এ দানের খবর পৌঁছে গেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নজিমুদ্দিনকে ১২ শতক জমি এবং পাকা বাড়ি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জীবিকা নির্বাহের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে একটি মুদি দোকান। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে উপহার পাওয়ার খবরে নাজিমুদ্দিনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি তো খুশির উপরে খুশি, হাসিনা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) যহন জিনিসটে আমারে দিছে, আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন হাসিনারে সুহে (সুখে) রাহে, হায়াত বাড়াই দেয়।”

শেরপুরের ঝিনাইগাতি জেলার এক ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন, বয়স ৮০ বছর। ভিক্ষা করে সংসার চালান। গত ২১ এপ্রিল কর্মহীনদের খাদ্য সহায়তার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ত্রাণ তহবিলে গত দুই বছরে সঞ্চয়ের ১০ হাজার টাকা দান করেন ওই ভিক্ষুক। নিজের বসত ঘর মেরামত করার জন্য দুই বছরে ভিক্ষা কওে জমিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। কিন্তু এ টাকা দিয়ে তার নিজের ঘর মেরামত না করে ওই টাকা দান করলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে কর্মহীনদের খাদ্য সহায়তার জন্য খোলা তহবিলে। গত ২১শে এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুর দুইটার দিকে মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের বাতিয়াগাঁও এলাকায় ইউএনও রুবেল মাহমুদের হাতে এ টাকা তুলে দেন ওই ভিক্ষুক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে ঘরবন্দী হওয়া কর্মহীন মানুষদের সরকারী ও বেসরকারীভাবে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কাজে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘দি প্যাসিফিক’ ক্লাবের সদস্য ও স্থানীয় ইউপি সদস্যরা কর্মহীন অসহায় দরিদ্রদের তালিকা প্রণয়নে গান্ধীগাঁও গ্রামে যান। এ সময় ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে তাকে ইউএনর’র পক্ষ থেকে খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার কথা বলে তার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চান তারা। পরে ভিক্ষুক ওই তালিকায় তার নাম না দেওয়া রজন্য অনুরোধ করেন । একই সঙ্গে ওই ভিক্ষুক বলেন, নিজের বসত ঘর মেরামত করার জন্য দুই বছরে ভিক্ষা করে জমিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। এ টাকা স্বেচ্ছায় বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহায়দের খাদ্য দেওয়ার জন্য দান করবেন বলে তিনি জানান। পরে গত ২১শে এপ্রিল মঙ্গলবার ‘দি প্যাসিফিক’ ক্লাবের সদস্য ও স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউএনও’র কাছে ওই ভিক্ষুককে নিয়ে আসলে তার জমানো ১০ হাজার টাকা ইউএনও’র হাতে তুলে দেন তিনি।

এ সময় ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন গনমাধ্যমকর্মীদের কাছে বলেন, “আমি ভিক্ষা করে খাইয়ে-খুইচরে দুই বছরে এ টেহা জড়ো করছি। আমার ঘরডা ভাঙ্গে গেছে গ্যা। এহন আর ঘর-দরজা দিলাম না। দশে এহন (মানুষ) কষ্ট করতাছে, আমি এ টেহ্যা ইউএনও সাহেবের হাতে দিলাম। দশেরে দিয়ে দেখ, খাইয়ে বাঁচুক।”

সোমবার গণভবন থেকে রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি উপজেলার ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনের মানবিকতার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘এই করোনার মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে একজন ফকির। যিনি ভিক্ষা করে খান, সাধারণ মানুষ। একসময় কৃষি কাজ করতেন। দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যাওয়ার পর আর কাজ করতে পারেননি, ভিক্ষা করেন।

ভিক্ষা করে করে মাত্র ১০ হাজার টাকা জমা করেছিলেন, তার থাকার ঘরটা ঠিক করবেন বলে। তার মাত্র একটা পা, গায়েও ছেড়া কাপড়। ঘরে ঠিকমত খাবারও নেই। কিন্তু তারপরও সেই মানুষটা জমানো ১০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন করোনাভাইরাসে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের সাহায্যের জন্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি মনে করি সারা বিশ্বে একটা মহৎ দৃষ্টান্ত তিনি সৃষ্টি করেছেন। এত বড় মানবিক গুণ আমাদের অনেক বিত্তশালীর মাঝেও দেখা যায় না। কিন্তু একজন নিঃস্ব মানুষ যার কাছে এই টাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই টাকা দিয়ে আরও দুটো জামা কিনতে পারতেন, ঘরে খাবার কিনতে পারতেন। এই করোনাকালে যে সমস্যা চলছে তার জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন, নিজের জন্য অনেক কিছুই চিস্তা করতে পারতেন, কিন্তু সে চিন্তা করেননি। তা ছাড়া এই সময় ভিক্ষা পাওয়া তো তার জন্য মুশকিল ছিল, তাও সে চিন্তা করেনি।

তার শেষ সম্বলটুকু দান করেছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মাঝে এখনো মানবিক বোধটা আছে। কিন্তু সেটা আমরা পাই কাদের কাছে ?

যারা নিঃস্ব তাদের কাছে। অনেক সময় দেখি অনেক বিত্তশালীরা হা-হুতাশ করে বেড়ায়। তাদের নাই নাই অভ্যাসটা যায় না। তাদের চাই চাই ভাবটাই সবসময় থেকে যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই কাজটি যিনি করেছেন তিনি শেরপুরের ঝিনাইগাতীর নাজিমুদ্দিন। ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন যে দৃষ্টাস্ত স্থাপন করেছেন, তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

বার্তা প্রেরক,

মোঃ শফিকুল ইসলাম জিহাদ, শেরপুর প্রতিনিধি

 

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন