রূপকথার মহানায়ক মাশরাফি

২০০৭ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপ। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আসরে অংশ নেয় বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। এ সময় দেশ থেকে ভয়াবহ এক দুঃসংবাদ পান তারা। মাশরাফিদের সতীর্থ-বন্ধু মানজারুল ইসলাম রানা খুলনায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ খবরে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো বাংলাদেশ দল। সতীর্থ খেলোয়াড়কে হারানোর ব্যথা বুকে চেপেই পোর্ট অব স্পেনের মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। এ শোকে ব্যথিত হয়ে সব শক্তি দিয়ে ভারতের বিপক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন হাবিবুল-মাশরাফিরা। বিশ্বমঞ্চে প্রথমবারের মতো ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে দেন তারা। বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়টি উৎসর্গ করা হয় মানজারুল রানার নামে। ম্যাচশেষে হাবিবুল বাশার বলেছিলেন, ‘আমাদের বন্ধু মানজারুল ইসলাম রানার নামে এ জয়টি উৎসর্গ করছি।’

এ বিশ্বকাপেই আরেক শক্তিশালী সাউথ আফ্রিকাকেও হারিয়ে অনন্য নজির দেখায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। অনিন্দ্য সুন্দর ক্রিকেট উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভেসেছিল দেশ। অবাক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়েছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে সুপার এইটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। গ্রুপপর্বে দুটি ও সুপার এইট পর্বে একটি জয় বাংলাদেশকে নিয়ে যায় অন্য এক উচ্চতায়।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারতের বিপক্ষে ওই একটি জয় এখনো রূপকথা হয়ে আছে। আর এ রূপকথার মহানায়ক মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামেন। পোর্ট অব স্পেনের মাঠে নড়াইল এক্সপ্রেসের আগুনে বোলিংয়ের সামনে ১৯১ রানেই অলআউট হয়েছিল ভারত। এর পরের নায়ক মুশফিক, সাকিব ও তামিম। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামা এই ত্রয়ীর ফিফটিতে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কাছে হেরে ওই বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই বাড়ির পথ ধরেছিলেন শচীন, গাঙ্গুলী, দ্রাবিড়, শেবাগরা।

দুই প্রস্তুতি ম্যাচেই বার্তা দিয়ে রেখেছিল বাংলাদেশ। প্রস্তুতি ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ২ উইকেটে এবং স্কটল্যান্ডকে ৭ উইকেটে হারিয়ে হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন দল পেয়েছিল আত্মবিশ্বাসের ভরপুর জ্বালানি। বেশ ভালোভাবে নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছিলেন মাশরাফি ও আব্দুর রাজ্জাকরা। প্রস্তুতি ম্যাচে মাশরাফি ৫টি ও রাজ্জাক ৭টি উইকেট শিকারে করে জানান দিয়ে রেখেছিলেনÑ আসল মঞ্চে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন তারা। প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটিংয়ে শুভ বার্তা দিয়ে রাখেন তামিম-সাকিবরাও। আসল লড়াইয়ে ব্যত্যয় ঘটেনি। শৈল্পিক ক্রিকেট খেলে বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়ে একের পর এক রূপকথার রচনা করে তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ান কোচ ডেভিড হোয়াটমোরের শিষ্যরা।

গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ভারত। এ প্রতিবেশী দেশের বিপক্ষে কিছু একটা করে দেখাতে পারে বাংলাদেশÑ এমন আভাস মিলছিল ওই প্রস্তুতি দুই ম্যাচের খেলায়। পোর্ট অব স্পেনের আর্দ্র পিচে টস জিতে আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয় দলের অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়। দুর্দান্ত সূচনার আশা ছিল। তাদের সেই আশা নিরাশা করে দেন মাশরাফি। নিজের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই তুলে নেন ভারতের অন্যতম সেরা ওপেনার বীরেন্দর শেবাগের উইকেট। কয়েক ওভার পর রবিন উথাপ্পার উইকেটও বগলবন্দি করেন মাশরাফি। শচীন রাজ্জাকের ঘূর্ণিফাঁদে পড়লে ভারতীয় স্কোর দাঁড়ায় ৭২/৩। এর পর যুবরাজ সিং ও সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতের ইনিংস টেনে সামনের দিকে নিয়ে যান। ৮৫ রানের জুটি গড়ে বিপর্যয়ের সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন তার। কিন্তু ৫ বলের মধ্যে এই দুই ব্যাটসম্যানও ড্রেসিংরুমের পথ ধরলে আবার বিপাকে পড়ে ভারত।

এর পর ধোনি, আগারকার ও হরভজন সিং কোনো রান না করেই আউট হন। শেষের জুটিতে জহির খান ও মুনাফ প্যাটেল ৩২ রান তুলে দলকে নিয়ে যান ১৯১-তে। বিশ্বকাপে সেরা বোলিং পারফরম্যান্স দেখান মাশরাফি। তার বোলিং বিশ্লেষণ ছিলÑ ৯.৩-২-৩৮-৪। মোহাম্মদ রফিক ও রাজ্জাক ৩টি করে উইকেট নেন। এর পর ব্যাটিংয়ের গল্পটা তিন তরুণকে ঘিরে। দেশের হয়ে পঞ্চম ওয়ানডে খেলতে নেমে জ্বলে ওঠেন তামিম। ৫৩ বলে ৫১ রানের ইনিংস উপহার দেন। ওয়ানডেতে তার প্রথম ফিফটি এটি। তামিম আউট হওয়ার পর বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ২/৬৯। তৃতীয় উইকেটে ব্যাটিংয়ে নৈপুণ্য দেখান বাকি দুই তরুণ মুশফিক-সাকিব। ১৮ বছর বয়সী মুশফিক খেলেন ৫৬ রানের ঝলমলে ইনিংস। ৫৩ রান আসে সাকিবের ব্যাট থেকেও। তাতে জয়ের কাছে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। নতুন করে লেখা হয় একটি উপাখ্যান।

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন