২০১৮ সালের মে’তে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নেন ‘আনকোরা’ এক ইংলিশ ফুটবল কোচ। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এমন একজনকে প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় অনেকেই বেশ অবাক হয়েছিলেন। সেটা হওয়ারই কথা। যিনি ইংল্যান্ডের নিচু সারির লীগের দায়িত্ব সামলান তিনি কিভাবে একটি জাতীয় দল পরিচালনা করবেন? সেই তিনি হলেন জেমি ডে।
বাংলাদেশ দলকে বদলে দেয়ার কারিগর। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশ দলকে তিনি আমূল বদলে দিতে পারেননি। আবার দলের মধ্যে পরিবর্তনও কম আনেননি। খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত জিম, পেশাদারিত্ব এই তিনটি জিনিস ফুটবলারদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন এই ইংলিশম্যান।
বাংলার ফুটবলাররা পুরো ৯০ মিনিট একই তালে খেলতে পারবে কি না তা নিয়ে ঘোর সংশয়ে থাকতেন ফুটবলপ্রেমীরা। জেমি ডে আসার পর সেটা নিয়ে আর ভাবতে হয় না।
জেমি ডে’র সঙ্গে নতুন করে ২ বছরের চুক্তি করতে যাচ্ছে বাফুফে। জেমি ডে বাংলাদেশকে নিয়ে তার নতুন লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর মধ্যে নিয়ে আসতে চান তিনি। উপহার দিতে চান সাফের শিরোপা। জেমি ডে এখন ইংল্যান্ডে অবস্থান করছেন। সেখানে স্থানীয় একটি খেলাধুলাবিষক সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলকে নিয়ে তার চ্যালেঞ্জের কথা, স্বপ্নের কথা।
এজেন্ট যখন বাংলাদেশের কোচ হিসেবে জেমি আবেদন করতে বলে তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। এমনকি বাংলাদেশ নামে যে পৃথিবীতে একটা দেশ আছে এটা জানতেনই না জেমি! তিনি বলেন, ‘এজেন্টের মাধ্যমে জানতে পারি বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রধান কোচের পদটা খালি রয়েছে। আমার এজেন্ট আমাকে বলে, বাংলাদেশ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বেশ নীচের দিকে রয়েছে। সেখানে কাজের ভালো সুযোগ পাবে তুমি। নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেখতে পারো। আমি তখন জানতামই না বাংলাদেশ পৃথিবীর কোথায় অবস্থিত। আমি ভাবলাম, নতুন চ্যালেঞ্জটা নেয়া যেতে পারে।’
সাক্ষতকারে বাফুফেকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশ অধ্যায়ের শুরু নিয়ে জেমি ডে বলেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে যেনো সীমাবদ্ধতার শেষ নেই। অনেকটা দুই জনের বেডে তিনজন ঘুমানোর মতো। তবে অনেক সাহায্য পেয়েছি আমি বাফুফের কাছ থেকে। আমার চাহিদা অনুযায়ী সহযোগিতা পেয়েছি। প্রথমে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়েছে। বাংলাদেশে কাজ করাটা আমি খুব উপভোগ করি। এখনো অনেক কিছু দেয়ার বাকি। বাংলাদেশের ফুটবলকে ভালো একটা অবস্থানে নিয়ে আসার স্বপ্ন আমার।’
২০১৮ এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে নিয়ে যান দ্বিতীয় রাউন্ডে। জেমি ডে’র কোচিংয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দল ১৬টি ম্যাচের সাতটিতে জিতেছে। পরাজয়ও সাত ম্যাচে। ড্র দুই খেলায়। আর অনূর্ধ্ব-২৩ দল ১১ ম্যাচের তিনটিতে বিজয়ের হাসি হেসেছে। ড্র দুই খেলায়। হার বাকি ছয়টিতে।
ভিন্ন সংস্কৃতি আর পরিবেশে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে কাজ করা নিয়ে জেমি বলেন, ‘সেখানে দিন শুরু হয় সূর্যোদয়ের বেশ আগে। তাপমাত্রাও বেশি। প্রথম দিকে গরমে সমস্যায় পড়তাম। বিশেষত অনুশীলনের সময়।’
‘ফুটবলের বাইরে বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বলতে চাই। সেখানকার খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন আমি দেখেছি। প্রতিটা দিন তাদের কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষ খুবই আন্তরিক। তারা ফুটবল ভালবাসে।’
বাফুফে অসহায়-দিনমজুরদের জন্য প্রতিদিন দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে একদিনের খাবার খরচের পুরোটা বহন করেছেন ৪০ বছর বয়সী এই কোচ।
বাংলাদেশে কাজ করলেও জেমির চার ছেলে ও স্ত্রী থাকেন ইংল্যান্ডে। বাংলাদেশের ‘হোটেল জীবন’ সম্পর্কে জেমি মজার ছলে বলেন, ‘আমি যখন ইংল্যান্ডে থাকি না আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে নিজের চুল ছিঁড়ে। কারণ সংসারের সব কাজ এবং সন্তানদের দেখভাল তাকেই একাই করতে হয়। তখন মনে হয় বাংলাদেশের হোটেল জীবনই ভালো। ওখানে (বাংলাদেশে) তো আর আমাকে এতো দায়িত্ব সামলাতে হয় না।’
‘তবে আমি ভাগ্যবান। পরিবার থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছি। প্রথমদিকে টানা দুইমাস বাংলাদেশে ছিলাম। এখন চার/পাঁচ সপ্তাহ পরপর বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে আসা হয়। পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছি বলেই গত দুইবছর বাংলাদেশে কাটাতে পেরেছ।












